Home / বিনোদন / ইলিশ ও শাড়ির টানে বাংলাদেশ যেতে চাই: রানী মুখার্জি

ইলিশ ও শাড়ির টানে বাংলাদেশ যেতে চাই: রানী মুখার্জি

দেবারতি ভট্টাচার্য: রানী বললেন, হিচকি অবশ্যই আমার ‘কামব্যাক’ ছবিরানী বললেন, হিচকি অবশ্যই আমার ‘কামব্যাক’ ছবি মুখে সেই চেনা হাসি। পরনে কালো জিনস ও টি-শার্ট। এক ফাগুনের উজ্জ্বল দুপুরে ‘যশরাজ স্টুডিও’-র মেকআপ রুমে এলেন বলিউড অভিনেত্রী রানী মুখার্জি।

তিন বছর পর আবার পর্দায় ফিরছেন তিনি। আগামীকাল ২৩ মার্চ মুক্তি পাচ্ছে রানী অভিনীত ছবি হিচকি। ছবি মুক্তির দুদিন আগেই তাঁর জন্মদিন। তবে বাবার প্রসঙ্গ উঠতেই মুহূর্তে মিলিয়ে গেল সেই প্রাণখোলা হাসি। কয়েক মাস আগেই বাবাকে হারিয়েছেন রানী। চোখের জল দিয়ে শুরু হলো এদিনের এই আড্ডা।

প্রশ্ন: বাবাকে ছাড়া আপনার প্রথম জন্মদিন হতে চলেছে। এ জীবনে জন্মদিনে বাবার কাছ থেকে পাওয়া সেরা উপহার কোনটি?
রানী মুখার্জি: (বাবার কথা শুনেই দুচোখ জলে ভরে ওঠে রানীর। অনেক কষ্টে চোখের জলকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন) বাবাই তো ঈশ্বরের দেওয়া সেরা উপহার। জানেন, আমি বাবার সঙ্গে খুব অ্যাটাচড ছিলাম। খুব কষ্ট হচ্ছে বাবার জন্য। বাবা আমার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা।

দুঃখিত, শুরুতেই আপনাকে কষ্ট দিলাম। ছবি মুক্তির দুদিন আগেই আপনার জন্মদিন। ছবি আর জন্মদিন প্রায় একসঙ্গে, এটা কি পরিকল্পনা করেই?
রানী মুখার্জি: না, না, ঠিক আছি। আসলে বাবার প্রসঙ্গ উঠলে কষ্ট হয়। না, পরিকল্পনা করে কিছু হয়নি। এই প্রথম আমার জন্মদিনের আশপাশে আমার অভিনীত ছবি মুক্তি পাচ্ছে। এর আগে কখনো তা ঘটেনি। তাই খুবই রোমাঞ্চিত। জন্মদিনের সময় আমি সাধারণত বিদেশে থাকি। এবার ছবি প্রচারণার জন্য দেশে আছি। প্রথমবার বাবাকে ছাড়া জন্মদিন পালন করব। বাবার শুভেচ্ছা ছাড়া আমার প্রথম জন্মদিন হবে। (আবার চোখের কোণে জল চিকচিক করে ওঠে)

প্রশ্ন: মাতৃত্ব সাধারণত বদলে দেয় নারী শরীরকে। কিন্তু সেই বদল আপনার মধ্যে দেখতে পাচ্ছি না। এর রহস্য কী?
রানী মুখার্জি: খুব কঠিন কাজ ছিল। মুখ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তার মানে আমি এই বলছি না যে, খাবার খেয়ো না। বলতে চাইছি, অপুষ্টিকর খাবার থেকে দূরে থাক। খাবার খাওয়া জরুরি। কিন্তু খাবার খেয়েও মানুষ যখন স্লিম থাকে সেটাই আসল ম্যাজিক।

প্রশ্ন: বলা যায়, ‘হিচকি’ আপনার ‘কামব্যাক’ ছবি। আপনি নিজে কী হিসেবে দেখেন?
রানী মুখার্জি: হিচকি অবশ্যই আমার ‘কামব্যাক’ ছবি। মাতৃত্বজনিত ছুটিতে ছিলাম। তিন বছর পর আবার পর্দায় ফিরে আসছি।
প্রশ্ন: আবার নিজের কাজের জগতে ফেরা কতটা কষ্টকর ছিল?
রানী মুখার্জি: আদিরা প্রি-ম্যাচিওর্ড বেবি ছিল। তাই ওর খেয়াল আরও বেশি করে রাখতে হতো। আদিরা আসার পর আমি একটু অলস হয়ে গিয়েছিলাম। আসলে মা হওয়ার পর বোধ হয় এ রকই হয়। ওর খুঁটিনাটি সব বিষয়ে আমি সব সময় সজাগ থাকতাম। দিনরাত কেট যেত আমার মেয়েকে নিয়ে। আমার যে একটা কাজের জগৎ আছে, তা ভুলতেই বসেছিলাম। আদি জোর করে আবার আমার দুনিয়ায় আমাকে ফেরায়। ও আমাকে বারবার বলত, ‘তুমি ভুলে যেয়ো না তুমি একজন অভিনেত্রী। তোমার ভক্তরা তোমার অপেক্ষায় আছে। অভিনেত্রী হিসেবে তোমারও একটা দায়িত্ব আছে।’ আদির জন্যই আবার কাজে ফিরতে বাধ্য হই।

প্রশ্ন: মাতৃত্ব কতটা বদলাতে পেরেছে রানীকে?
রানী মুখার্জি: সব মেয়েই মা হওয়ার পর অনেকটাই বদলে যায়। আর আমি মনে করি, মা হওয়ার পর একজন নারী সম্পূর্ণরূপে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারে। তাই একজন মেয়ের মা হওয়া খুব জরুরি। সে এক অপার্থিব অনুভূতি। আমি কত ছবিতে মা হয়েছি। কিন্তু বাস্তবে যখন মা হলাম তার সুখই আলাদা।

প্রশ্ন: মা, স্ত্রী, অভিনেত্রী—এই তিন সত্তাকে একসঙ্গে সামলাচ্ছেন কী করে?
রানী মুখার্জি: ব্যালান্স করে তো চলতেই হয়। সব মেয়েকে তাই করতে হয়। তবে এই মুহূর্তে আদিরাকে বেশি করে সময় দিতে হয়। আমার জীবনের কিছুটা ওর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আদিরার যখন ১৪ মাস বয়স তখন আমি হিচকির শুটিং শুরু করি। তবে আমি সব সময় চেষ্টা করি দুপুরের মধ্যে কাজ সেরে মেয়ের কাছে ফিরে যেতে। হিচকির শুটিং-এর সময় আমি সকাল ছয়টায় সেটে চলে যেতাম। ছয় ঘণ্টা কাজ করে আবার দুপুরে বাড়ি ফিরে যেতাম।

প্রশ্ন: ‘হিচকি’-তে আপনার অভিনীত চরিত্রের নাম ‘নয়না মাথুর’। রানী থেকে নয়না হয়ে ওঠার প্রস্তুতি কেমন ছিল?
রানী মুখার্জি: রানী থেকে নয়না হয়ে ওঠার পেছনে আসল মানুষটি হলেন আমেরিকার জর্জিয়ার ব্র্যাড কোহেন। নিশ্চয় জানেন, ‘ট্যুরেট সিনড্রম’ নামের এক স্নায়ুরোগের ওপর নির্মিত এই ছবিটি। ফ্রন্ট অব দ্য ক্লাস আমেরিকান এই ছবিটি আমেরিকার ব্র্যাড কোহেনের জীবনের ওপর। ব্র্যাড বাস্তবে এই স্নায়ুরোগটির শিকার। তাই নয়না হয়ে উঠতে আমাকে ব্র্যাডের সাহায্য নিতে হয়েছে। আমি স্কাইপে-তে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলতাম। তাঁর কাছ থেকে অনেক ইনপুট নিতাম। এ ছাড়া ট্যুরেট সিনড্রমের ওপর ইউটিউবে অনেক ভিডিও দেখেছি।

প্রশ্ন: আপনার জীবনের ‘হিচকি’ নিয়ে যদি কিছু বলেন?
রানী মুখার্জি: ওরে বাবা! আমার জীবন তো হিচকিতে ভরা ছিল। ছোটবেলায় আমি কথা বলতে গিয়ে তোতলাতাম। আসলে আমার মা আর দাদা তোতলা ছিল। আর ওদের নকল করতে করতে আমার মধ্যে অজান্তে এই সমস্যাটা ঢুকে যায়। তারপর নিজের চেষ্টাতেই এই সমস্যা কাটিয়ে উঠি। একজন অভিনেতার কাছে এটা যে কত বড় চ্যালেঞ্জ, তা আশা করি বুঝতে পারছেন। এরপর আমার অন্তরায় ছিল আমার গলার স্বর। আর এই নিয়ে আমাকে অনেক কটূক্তি সহ্য করতে হয়। আসলে অনেকের মতে, আমার কণ্ঠস্বর নায়িকাসুলভ নয়। আমার প্রথম হিন্দি ছবি রাজা কী আয়েগি বরাত-এ আমি নিজে ডাবিং করি। তবে বিক্রম ভাটের গুলাম ছবিতে আমার নিজের ভয়েস ছিল না। আমির খান, বিক্রমের মনে হয়েছিল আমার গলার স্বর তথাকথিত নায়িকাদের মতো পাতলা নয়। এই সময় আমি করণ জোহরের কুছ কুছ হোতা হ্যায় ছবিতে কাজ করছিলাম। আমার গলার স্বরকে প্রথম কাজে লাগায় করণ। এই ছবিতে ও আমাকে দিয়েই ডাবিং করায়। করণ আমাকে বলেছিল, একজন অভিনেতার কণ্ঠস্বরই তার পরিচয়। আর এর জন্য আমি করণের কাছে কৃতজ্ঞ। কুছ কুছ হোতা হ্যায় রিলিজের পর ছবিটি দেখে আমির ফোন করে আমাকে ‘স্যরি’ বলে। গুলাম ছবিতে আমার ভয়েস ব্যবহার করা হয়নি বলে পরে আমিরের আফসোস হয়েছিল। আমার উচ্চতা ক্যারিয়ারের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে আমি খুব লাকি যে তখন শাহরুখ, সালমান, আমিরের সঙ্গে কাজ করেছি। ওদের পাশে আমাকে দিব্যি মানিয়ে গিয়েছিল।

প্রশ্ন: বাস্তবে আপনার মধ্যে শিক্ষিকার কোন কোন গুণ আছে?
রানী মুখার্জি: প্রচুর গুণ আছে। সুযোগ পেলেই আমি শিক্ষা দিতে শুরু করে দিই। (সশব্দে হেসে)

প্রশ্ন: আর ছাত্রী হিসাবে আপনি কেমন ছিলেন?
রানী মুখার্জি: আমি চিরকালই শিক্ষকদের খুবই অনুগত ছিলাম। সব সময় চেষ্টা করতাম শিক্ষিকাদের গুডবুকে থাকার।

প্রশ্ন: এই ডিজিটাল যুগে আপনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেই। এর কি কোনো বিশেষ কারণ আছে?
রানী মুখার্জি: আমার কাছে এই মাধ্যমটা একদম গুরুত্বহীন। কম্পিউটারের ওপারে থাকা মানুষটাকে আমি চিনি না, জানি না। সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়াই আমি এত বছর এই ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে আছি।

প্রশ্ন: ‘মরদানি’-র পর আবার অন্য ধারার ছবিতে আপনি। চিত্রনাট্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে কি এখন একটু বেশি ভাবনাচিন্তা করেন?
রানী মুখার্জি: জীবনের এই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে অবশ্যই চিত্রনাট্য নিয়ে একটু বেশি সতর্ক থাকতে হয়। এই বিষয়টা বাবার থেকে শিখেছি। তিনি বুঝিয়েছিলেন, ছবির ক্ষেত্রে চিত্রনাট্য হলো শিরদাঁড়া। চিত্রনাট্য দুর্বল হলে সিনেমা ঝুলে যাবে। আর চিত্রনাট্য সবল হলে ছবি সোজা হয়ে দাঁড়াবে।

প্রশ্ন: মরদানির পর হিচকি—এই দুটো ছবিতেই আপনি নারীশক্তির প্রতীক। ব্যক্তি রানীকে কে শক্তি জোগায়?
রানী মুখার্জি: আমার মা-ই আমাকে সব শক্তি জোগায়। বাঙালি মেয়েরা মানসিকভাবে একটু বেশি দৃঢ় হয়। এদের মধ্যে লড়াই করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা থাকে।

প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন, বাংলাদেশে আপনি আগে গেছেন। আবার বাংলাদেশ কিসের টানে যেতে চান?
রানী মুখার্জি: হা, হা, (সশব্দে হেসে) ইলিশ মাছ। শাড়ি। এই দুটোর টানে বাংলাদেশ যেতে চাই। আমি বাংলাদেশে গিয়ে খুব ইলিশ মাছ খেয়েছিলাম। আর অনেক শাড়ি নিয়ে এসেছিলাম।-প্রথম আলো