Home / এক্সক্লুসিভ / রোগীর মায়ায় ডাক্তারের চোখে জল!

রোগীর মায়ায় ডাক্তারের চোখে জল!

মেডিসিনে আমার কাটানো দিনগুলোই খুব সম্ভবত অপেক্ষাকৃত দায়িত্বে, দৃঢ়তায়, আত্মবিশ্বাসে আর বর্ণিলভাবে কেটেছে। আমার রোগীদের নিয়ে আমার যে কী পরিমাণ গল্প জমা তার কোনো ইয়ত্তা নেই! এগুলো আমি সবাইকে বিরক্ত করার জন্য নয়, নিজের জন্যই লিখি। বলা তো যায় না যখন কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না এগুলোই হলো আমার ফুয়েল।

মেডিসিনে শুরুর দিকে ডায়াগনোসিস করতে চাইবার একটা ঝোঁক ছিল। আমার প্রভিশনাল ডায়াগনোসিস যাতে ক্লিনিক্যাল ডায়াগনোসিস হয় এমন একটা প্রার্থনাও ছিল। তো এই রকম যখন সময় তখন আমার বেডগুলোয় যাতে ভালো ভালো (!) পেশেন্ট পড়ে। আমি যাতে ভালো করে হিস্ট্রি নিয়ে ডায়াগনোসিস করতে পারি সেই চেষ্টাই থাকত।

এক অ্যাডমিশনে আমার বেডে একজন পেশেন্ট ভর্তি হলো। আমি গেলাম রিসিভ করতে, গিয়ে দেখি তাকে ধরাধরি করে বেডে দেয়া হচ্ছে। তার তিল পরিমাণ নড়বার ক্ষমতা নেই! শুধু তাই না, হিস্ট্রি নিতে গিয়ে দেখি তার গলা থেকে আওয়াজও আসে না। তিনি শুধু ঠোঁট নাড়েন!

তার স্ত্রীর সহযোগিতায় এবং রাজ্যের কাগজপত্র ঘেঁটে বোঝা গেল কেইস খুব কম্প্লিকেটেড। শ’খানেক এই টেস্ট সেই টেস্ট করা, নিউরোসায়েন্স-ডিএমসি-প্রাইভেট হসপিটাল থেকে ফেরত আসা এই রোগী নিয়ে তখন আমি অকুল পাথারে। আমি হাড়ে-মাংসে বুঝতে পারছিলাম যে, আমি এর কিছুই করতে পারব না।

মনটা খারাপও হলো। আহমেদ স্যারের সামনে এই রোগী নিয়ে রোজ সকালে কী জবাব দেব, তা ভাবতেই গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল! আমার কপালেই এটা হওয়ার ছিল এই ভেবে আরেকবার মন খারাপ করে কাজে মন দেয়াই উচিত বিবেচনা করলাম।

ধীরে ধীরে এই রোগীটার জন্য আমার কী পরিমাণ মমতা তৈরি হয়েছিল তা বর্ণমালায় প্রকাশ করা যাবে না।

৫’৫”-৫’৮” উচ্চতার সম্পূর্ণ সুস্থ সুঠাম একজন মানুষ যখন মাথায় পাটের গাঁট নিয়ে চলতে গিয়ে হঠাৎ পড়ে যায়। এক মুহূর্তে তার জীবন যখন একটা বিছানায় বন্দি হয়ে যায়। আর আপনি রোজ সকালে তাকে দেখেন। কথা বলেন। তার ওপর আপনার মায়া না পড়ে যায় কই!

আমি লোকটার চেহারা দেখলেই অবাক হয়ে যেতাম। সেখানে তার এই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার কোনো চিহ্ন নেই! ঘাড়ের চারটা ভার্টেব্রা (ঘাড়ের হাড়) দুমড়েমুচড়ে যাওয়া মানুষটার মাথা এপাশ থেকে ওপাশে নাড়ানোরও অনুমতি ছিল না।

তার শুধু ছিল একজোড়া ভীষণ জলজলে চোখ। আমি বেশিক্ষণ সে চোখে তাকাতে পারতাম না (সেখানে রাজ্যের প্রশ্ন ছিল, একরাশ ভয় ছিল আর যেটা ছিল তা হলো আশা যেটাকে আমি সব থেকে বেশি ভয় করতাম)।

আমাকে ঠোঁট নেড়ে কি কি সব বলতে চাই তো, আমিও শোনার চেষ্টা করতাম বোঝার ভান করতাম! এই মানুষটার পরম সৌভাগ্যের একটা জায়গা ছিল হার না মানা হাল না ছাড়া সহধর্মিনী। কতবার যে এই মহিলার ভিজে গলার প্রশ্ন শুনে আমার চোখ ভিজে গেছে। ধরাও পড়েছি দু একবার! এমনই তার স্থিরতা আর চেষ্টা যে আমার মাঝে মাঝে খুব আশা হতো।

ধীরে ধীরে অ্যান্টিবায়োটিক আর বারবার নেবুলাইজ করার পর যখন তার এসপিরেশান নিউমোনিয়া ভালো হয়ে গেল তখন রোগী স্পষ্ট ভাষায় কথা বলল।

আমি তার ইচ্ছের কথা তার নিজমুখে শুনলাম। না সে আবার ওঠে দাঁড়িয়ে মাথায় পাটের বোঝা তুলে নিতে চায় না, হেঁটে হেঁটে এই শহর ছাড়িয়ে কোনো বন-পাহাড়ে হারিয়ে যেতেও চায় না,

সে যা চায় একবার ওঠে বসতে। চায় হুইলচেয়ারে করে হলেও ঘাড় সোজা করে একবার আকাশটা দেখতে। চায় এভাবে অচল অনড় হয়ে বিছানায় বন্দিজীবন থেকে মুক্তি।

আমি তার চাওয়া শুনে অভিভূত হয়ে যাই। পরম করুণাময় আমাকে কত দয়ার সাগরে ভাসিয়ে রেখেছেন তা আমি এর চেয়ে ভালো আর কি করে বুঝতাম?

আমার এ রোগীর জন্য আমি কী করেছি, কী করতে পারতাম এবং কী করা যেত তার হিসেবে আমি যাব না। তার যাতে সার্জারিটা হয় তার জন্য আমি মেডিসিনে থেকে যতখানি চেষ্টা করা যায় করেছি। আলহামদুলিল্লাহ।

একটা আফসোস রয়ে গেছে যে, তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন, তা জানা হয়নি। নিউরোসার্জারিতে প্লেসমেন্ট হওয়ায় ঘুরে ফিরে ওই রোগীর কথা মনে পড়ছে।

তাকে যে বেডে রেখে গিয়েছি সেটা খালি। এখন কে জানে হয়তো আমি থাকতে থাকতে হুইলচেয়ারে করে তিনি ফলোআপে চলে আসলেন! আমি তাকে ঠিকই চিনে ফেলব তিনি না চিনলেও।

এই প্রফেশনে আসতে চেয়েছিলাম কিনা, কেন আসলাম, থাকব কিনা এগুলোর হিসেব এখন আর মাথায় আসে না (because I feel so blessed here that I consider myself as I am chosen)।

এমনিও মানুষ নিজের মর্জিতে কি করে? পরম করুণাময় সব নির্ধারণ করেন। তাই আমার এই হোয়াইট কোড, দিস ইজ এ ব্লেসিং ফ্রম অলমাইটি।

যত ভায়োলেন্স হোক, দেশে বিদেশে যত অসৎ ডাক্তার থাকুক, ডাক্তারদের ছোট করা হোক আর বড়, রোজ দিনকার শ্রমের ঘামের রোগীর জন্য এই অবিরাম কষ্ট মিডিয়ায় প্রকাশ না পাক, দিস প্রফেশন উইল রিমেইন স্যাক্রেড।

কারণ আমি অসংখ্য রোগীর চোখে, তাদের স্বজনের চোখে, ডাক্তারের প্রতি শ্রদ্ধা দেখেছি। পরম নির্ভরতা দেখেছি। এই আস্থা এত সস্তায় মুছে যাওয়ার নয়।

লেখক: ইন্টার্ন ডাক্তার, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ। কনটেন্ট ক্রেডিট: মেডিভয়েস