Home / অপরাধ সংবাদ / সুইপার থেকে কোটিপতি হওয়া কে এই মালেক

সুইপার থেকে কোটিপতি হওয়া কে এই মালেক

আবদুল মালেক। একসময় অন্যের জমিতে কামলা দিতেন। যা আয় হতো, তা দিয়ে কোনো রকমে চলত সংসার। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে স্থানীয় এক নেতার আশীর্বাদে তানোর থানার ওসির ব্যক্তিগত কাজ করার সুযোগ পান তিনি। এরপর থানায় অস্থায়ী ভিত্তিতে সুইপারের কাজ পেয়ে যান।

এর কিছুদিন পর সুইপার পদে স্থায়ী নিয়োগ পান। এখনও তিনি সুইপার পদেই কর্মরত। এর বাইরে আবদুল মালেকের ব্যবসা-বাণিজ্য বা দৃশ্যমান কোনো আয়ের উৎস নেই। কিন্তু এই মালেক এখন কোটিপতি। তানোর পৌর সদরে তিনটি বাড়ি বানিয়েছেন। এর মধ্যে একটি চারতলা, একটি তিনতলা, আরেকটি নির্মাণাধীন আছে।

নির্মাণাধীন বাড়িটিরও এরই মধ্যে দ্বিতীয় তলার কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া গ্রামের বাড়ি কালনা এলাকার মাঠে জমি কিনেছেন ২০ বিঘা। গোপনে আরও রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা। এখন তার চলাফেরা রাজকীয়। নিজে সুইপারের কাজ করেন না, করান হালিমা নামে এক মহিলাকে দিয়ে। কীভাবে মালেক এত সম্পদের মালিক হলেন- এ প্রশ্নই এখন অনেকের।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে যা বেরিয়ে এসেছে তা হল, আবদুল মালেকের বাবা আবদুল খালেকের জন্মস্থান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায়। ষাটের দশকে আবদুল খালেক ভারত থেকে এসে তানোরের কালনা গ্রামে মামা আবুল হোসেনের বাড়িতে আশ্রয় নেন।

আবদুল খালেক ছিলেন দিনমজুর। বাবার মতো আবদুল মালেকও জীবননির্বাহ করতে দিনমজুরের কাজ শুরু করেন। ২০০১ সালে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত শীষ মোহাম্মদ আবদুল মালেককে থানার তৎকালীন ওসির ব্যক্তিগত কাজে নিয়োগ দেয়ার জন্য সুপারিশ করেন। এ সময় তিনি সুইপার হিসেবে অস্থায়ী নিয়োগ পান।

অল্প সময়ের ব্যবধানে তার চাকরি স্থায়ী হয়। আর চাকরির সুবাদে হয়ে ওঠেন তানোরে বিভিন্ন সময়ে আসা ওসিদের প্রিয়ভাজন। ওসিদের সঙ্গে ভালো সম্পর্কের কারণেই এসআই থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত সবাই আবদুল মালেকের ভয়ে তটস্থ থাকেন। কেউ তার অনৈতিক কাজের প্রতিবাদ করেন না। এভাবেই দেড় যুগে ওসিদের আস্থাভাজন হয়ে মামলার তদবির করে অঢেল সম্পদ আর বিত্তবৈভবের মালিক বনে যান মালেক।

স্থানীয়রা জানান, সাধারণত ওসির পরিবারের সদস্যরা রাজশাহী নগরীতে অবস্থান করেন। আর এ সুযোগে নিজ বাড়ি থেকে খাবার সরবরাহ করেন মালেক। ওসির বিভিন্ন ধরনের পারিবারিক কাজেও সহযোগিতা করেন তিনি। এভাবেই ওসির আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন মালেক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, মালেক শূন্য থেকে কোটিপতি হয়েছে। তানোর পৌর সদরে গোল্লাপাড়া মৌজায় ৩০ শতাংশ জমির ওপর তার তিনটি বাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে দুটি বাড়ি ছাত্রাবাস হিসেবে ভাড়া দিয়েছে। প্রতিমাসে ছাত্রাবাস দুটি থেকে এক লাখ টাকা ভাড়া পায়।

আর অপর বাড়িটি নির্মাণাধীন অবস্থায় রয়েছে। মাঠে রয়েছে ২০ বিঘা জমি। নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে অঢেল টাকা। মালেকের জীবনযাপন এখন বিলাসবহুল। ব্যবহার করে দামি মোটরসাইকেল। মালেক ওসির ডানহাত হিসেবে পরিচিত। তাই কারও কথা সে শোনে না এবং মানে না। আমরা পুলিশ অফিসার, কিন্তু মালেক আমাদের কোনো অফিসারের নির্দেশ মানে না।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, আবদুল মালেক সাধারণ ডায়েরি থেকে শুরু করে বড় বড় মামলার তদবির করেন। মূলত হত্যা, চোরাচালান, মাদক এবং জমি দখলসহ বড় মামলাগুলোর তদবির করে তিনি হাতিয়ে নেন টাকা। থানার ওসিকে তিনি যেভাবে বলেন, সেভাবেই কাজ হয়।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবদুল মালেক। তিনি ফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি চাকরির পাশাপাশি মাছচাষ করি। আমার ২৫ বিঘার তিনটি পুকুর রয়েছে।’ তিনটি বাড়ি এবং ২০ বিঘা জমির মালিক কীভাবে হলেন, এর কানো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। নিজের পরিবর্তে হালিমা নামে এক মহিলাকে দিয়ে সুইপারের কাজ করানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি ও হালিমা দু’জনেই একসঙ্গে কাজ করি।’ অভিযোগ সম্পর্কে কথা বলার জন্য তিনি প্রতিবেদককে সরাসরি যোগাযোগ করতে বলেন।

তানোর থানার ওসি রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘মালেকের সম্পদের ব্যাপারে কিছু জানি না। যদি এ ব্যাপারে কেউ অভিযোগ করেন, তাহলে তদন্ত করে দেখব।’ মালেকের সঙ্গে ওসির সখ্যের বিষয়টি সঠিক না বলে দাবি করেন এ পুলিশ কর্মকর্তা।